বেপজার সর্ববৃহৎ উদ্যোগ
২০১৮ সালে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে অবস্থিত ‘জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে’ একটি বৃহৎ শিল্প জোন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় বেপজা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালে বেজা থেকে জমি বুঝে পায় প্রতিষ্ঠানটি। যদিও বর্তমানে বেপজার অধীনে পরিচালিত আটটি ইপিজেডের মোট আয়তন মাত্র ২ হাজার ৩০৭ একর, অন্যদিকে শুধু বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের আয়তনই ১ হাজার ১৩৮ দশমিক ৫৫ একর, যা এককভাবে বেপজার অধীন জোনগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ শিল্প জোন।
বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের লক্ষ্যে ২০২০ সালে ভূমি উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে এ অঞ্চলকে ইজেড-১ এবং ইজেড-২ নামে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য এখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত মোট ৫৩৯টি শিল্প প্লট (প্রতিটি ৩ হাজার ৬০০ বর্গমিটার আয়তনের) তৈরি হচ্ছেন যার মধ্যে বেপজা ইজেড-১ অঞ্চলে ২৭৯টি এবং বেপজা ইজেড-২ অঞ্চলে ২৬০টি। ২০২২ সালে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রথম প্লট বরাদ্দ দেয়া শুরু হয়; এরই মধ্যে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের লক্ষ্যে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অনুকূলে ২৭৩টি প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আশার কথা হলো প্রকল্প চলাকালীনই লিজ চুক্তি স্বাক্ষরকৃত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠান বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে তাদের উৎপাদন শুরু করেছে।
চট্টগ্রাম শহর থেকে এ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে হলেও এখানে গড়ে উঠেছে বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ। অর্থনৈতিক অঞ্চলের পাশেই সমুদ্র—বঙ্গোপসাগর। পণ্য আমদানি-রফতানিতে যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধার কারণে বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি তৈরি করেছে নতুন এক মাত্রা। এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে উৎপাদিত পণ্য বিনিয়োগকারীরা সহজেই সড়কপথের পাশাপাশি সমুদ্রপথেও পরিবহন করতে পারবেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে নির্মল পরিবেশে প্রতিষ্ঠিত বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল শুরু থেকেই বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করছে। এ অঞ্চল ঘিরে তাই বিনিয়োগ বিপ্লবের স্বপ্ন দেখছে বেপজা। এরই মধ্যে ৪৪টি দেশী-বিদেশী শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের লক্ষ্যে বেপজার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে; যাদের মোট প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ডলার। চালু চারটি প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ৩ হাজার ৬৫২ জন বাংলাদেশী নাগরিক কর্মরত রয়েছেন। বর্তমানে এসব কারখানায় উৎপাদন হচ্ছে লনজারি পণ্য, স্যু ও স্যু অ্যাকসেসরিজ এবং টেক্সটাইল পণ্য। এছাড়া উৎপাদন শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে আরো পাঁচটি কারখানা, নির্মাণাধীন রয়েছে ২০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
শিল্প জোনটি পুরোপুরি চালু হলে এখানে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। উৎপাদন শুরু এবং নির্মাণকাজ শুরু করা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এ পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছে ৫৫ মিলিয়ন ডলার। পরিপূর্ণভাবে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হলে এখানে পরিকল্পিত শিল্প বিপ্লব হওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অঞ্চলের উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রফতানির পাশাপাশি দেশীয় বাজারেও বিক্রি করতে পারবেন বিনিয়োগকারীরা।
স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি
স্থানীয় ইছাখালী, মঘাদিয়া, সাহেরখালীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের অনেক শ্রমিক বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারখানাগুলোয় কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে তাদের পরিবারের অভাব দূর হয়েছে এবং তারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। পুরুষ শ্রমিকের পাশাপাশি নারীরাও সমান তালে কাজ করছেন এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে, যা সার্বিকভাবে স্থানীয় কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জোনটি পুরোপুরি চালু হলে এটি স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মাইলফলক হবে বলে আশা করছে বেপজা।
পরিবেশবান্ধব শিল্প জোন
ইপিজেড পরিচালনায় প্রায় দীর্ঘ ৪৫ বছরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বেপজা এ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে একটি পরিবেশবান্ধব শিল্প জোন হিসেবে গড়ে তুলছে। ‘ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে বাগান নয়, বাগানের মধ্যে ইন্ডাস্ট্রি’ কনসেপ্টে নির্মিত অঞ্চলটিতে প্রতিটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জমির ৪৬ শতাংশ রাখা হয়েছে অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও সবুজায়নের জন্য। প্রতিটি সেক্টরে সবুজায়নে রাস্তা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চারদিকে প্রশস্ত জায়গা সংরক্ষণ করা হয়েছে। কারখানাগুলো পরবর্তী সময়ে ব্যবহারের লক্ষ্যে নিজস্ব ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সংস্থান রাখা হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয়ভাবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় পানি সংরক্ষণাগার তৈরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনায় ২৫ কিলোমিটার ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং পানি সংরক্ষণের জন্য একটি লেকও নির্মিত হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিজেদের ব্যবহারের জন্য কারখানা ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের নির্দেশনা প্রদান করেছে বেপজা। কারখানা ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের ব্যবস্থা, জোন এরিয়ায় সোলার লাইট স্থাপন এবং পর্যাপ্ত বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে যে কারখানাগুলো সেগুলোকে প্লট বরাদ্দ থেকে বিরত রাখা হয়েছে এবং ড্রাই ইন্ডাস্ট্রিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
বিনিয়োগকারীর অভিজ্ঞতা
চীনা কোম্পানি ‘খাইশি লিনজেরি বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড’-এর পরিচালক শিয়াও হং বলেন, ‘মিরসরাইয়ে অবস্থিত বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিবহন খরচ চট্টগ্রাম শহর ছাড়া অন্য যেকোনো শহরের তুলনায় অনেক কম। এখানকার আবহাওয়া খুবই ভালো। এখানে শ্রমিক সংকট নেই। এখন এত বেশি শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে যে কারখানায় কাজের সুযোগ সৃষ্টির আগেই শ্রমিকরা যোগাযোগ করছেন। আরেকটা বিষয় হলো বেপজা বিনিয়োগের জন্য একটি নিরাপদ জোন। এখানে প্রতিটি কারখানাকে সরকার নিরাপত্তা দিচ্ছে। বেপজা খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের সহায়তা করছে।’
আরেক চীনা কোম্পানি ‘কেপিএসটি সুজ’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক লুও ঝেংশিয়ান বলেন, ‘কেপিএসটি স্যুজ বেপজার ইজেড-১ অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবস্থিত। আমরা ২০২৩ সালে উৎপাদন শুরু করি। বেপজা থেকে ছয়টি প্লট বরাদ্দ পেয়েছি। এখানে আমরা স্যু অ্যাকসেসরিজ উৎপাদন করি। বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে আমরা এরই মধ্যে ৮ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছি। আমাদের উৎপাদিত পণ্য দেশে বিপণন ও রফতানি করা হচ্ছে। বেপজা থেকে আমাদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়ে থাকে।’
শ্রমিকদের জীবন বদলের গল্প
সায়েমা সুলতানা। বাড়ি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মায়ানী ইউনিয়নে। দেড় বছর আগে তিনি কাজ করতেন চট্টগ্রামের একটি পোশাক কারখানায়। সেখানে যে বেতন পেতেন তা দিয়ে খাওয়া-দাওয়া ও বাসা ভাড়া মেটানোর পর হাতে কিছুই থাকত না।
বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হওয়ার পর চট্টগ্রাম শহরের চাকরি ছেড়ে তিনি কেপিএসটি স্যুজ বাংলাদেশ লিমিটেডে কোয়ালিটি কন্ট্রোলার হিসেবে যোগ দেন। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে শ্রমিক পরিবহন ব্যবস্থা থাকায় এখন তিনি নিয়মিত যাতায়াত করেন বাড়ি থেকে। এতে তার বাসা ভাড়া, যাতায়াত ও খাওয়া-দাওয়ার খরচ বাঁচছে। সঙ্গে পাচ্ছেন পরিবারের সান্নিধ্য। সুলতানা বলেন, ‘আগে শহরে চাকরি করতাম, খরচ মেটাতে পারতাম না। এখন বাড়ি থেকে যাওয়া-আসা করে মাস শেষে বেতনের অনেকাংশ টাকা জমাতে পারছি।’
আরেক শ্রমিক মেহেদী হাসান বাপ্পী বলেন, ‘আমরা বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে চট্টগ্রাম ইপিজেডের মতো সব সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি। ফলে জীবিকা নির্বাহের পরও কিছু টাকা সঞ্চয় থাকে।’
বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের গতি বাড়ছে
মোহাম্মদ এনামুল হক
প্রকল্প পরিচালক
বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল
বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল একটি চমৎকার, নিরিবিলি ও সাগরঘেঁষা পরিবেশে অবস্থিত। এখানে ইতিমধ্যে ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান জমি বরাদ্দ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চারটি ইতোমধ্যে উৎপাদনে গেছে। উৎপাদনের অপেক্ষায় রয়েছে আরও পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। ছয় মাসের মধ্যে আরও ২০টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করবে।
ডিউটি-ফ্রি আমদানী রপ্তানী সুবিধা, ১০ বছর পর্যন্ত ট্যাক্স হলিডে ও বেপজা প্রদত্ত ওয়ান-স্টপ সেবাসহ নানা প্রণোদনায় দিন দিন এখানে বিনিয়োগের গতি বাড়ছে।
সম্ভাব্য পণ্য
বেপজার সঙ্গে লিজ চুক্তি স্বাক্ষরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখানে যেসব পণ্য উৎপাদন করবে তার মধ্যে রয়েছে—লনজারি, ড্রোন, তৈরি পোশাক, স্যু অ্যাকসেসরিজ, ব্যাগ, প্যাকেজিং উপকরণ, ফিনিশড লুব্রিক্যান্টস, তাঁবু, গার্মেন্ট অ্যাকসেসরিজ, চুলের ফ্যাশন আনুষঙ্গিক, সুতার পণ্য, হাসপাতালের পণ্য, ব্যাগ, ম্যাট্রেস, মোজা ওয়ালেট, ফার্নিচার, ওভেন প্যান্ট, ওভেন জ্যাকেট, কার্টন, টোব্যাকো মেশিনারি, টোব্যাকো প্রসেসিং, ব্যাটারি প্লান্ট, প্যাডিং, হাসপাতালের সামগ্রী, এপিআই ইত্যাদি।